আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক হাশেম রেজাকে হত্যার পরিকল্পনা

আটক রানার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনাকারী গডফাদার সফিকুল ইসলাম সফিকের নামসহ বদর উদ্দিন (বদখরা), রাশেদুজ্জামান হিরক (হিরো) ও শামীমের নাম উঠে আসে

ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সহ-সম্পাদক হাশেম রেজাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পরিকল্পনা করেছে চুয়াডাঙ্গার একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। টাকা লেনদেনসহ তিনটি অস্ত্রও ঠিক করা হয় যেকোনো মূল্যে হাশেম রেজাকে মেরে ফেলার জন্য। কীভাবে, কোন স্থানে, কোন সময়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় তার চূড়ান্ত পরিকল্পনায় জড়িত থাকা একজন হাশেম রেজাকে এ তথ্য জানিয়ে দেন। যাতে মৃত্যু থেকে বাঁচতে হাশেম রেজা সতর্ক থাকেন।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি শুধু হাশেম রেজাকে নয়, এর আগেও ওই এলাকায় আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার কোনো বিচার এখনো হয়নি। অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা প্রতিনিয়ত ছিনতাই ও দখলবাজি করে যাচ্ছে। অতীতের বিচারগুলো না হওয়ায় ওই এলাকার অনেকেই বিচারহীনতায় ভুগছেন। অতীতে কুড়ুলগাছী ইউনিয়নের দর্শনা থানায় খুন হওয়া আট ব্যক্তি হলেন- সালেকিন মেম্বার, পিতা- মৃত সামছুল আরেফিন, আব্বাস মোল্লা, পিতা মৃত- আজিজুল মোল্লা, মো. ইসমাঈল, পিতা মৃত- নূর হোসেন, মো. আফসার, পিতা মৃত- বাদশাহ, ববিতা খাতুন, পিতা- নুরুল ইসলাম, মো. মোমিন, পিতা মৃত- আফসার, ফকির বদ্দি, পিতা- সামু বদ্দি, ছোট খাতুন, পিতা- মধু। স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি পর্দার অন্তরালে থাকায় ওই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার হয়নি বলে দাবি প্রশাসনের একটি সূত্রের।
এদিকে সম্প্রতি হাশেম রেজাকে যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় তার সম্পূর্ণ অডিওর তথ্য পাঠকদের উদ্দেশে হুবহু তুলে ধরা হলো-

পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা।
হাশেম রেজা : বলছি বল এবার, এবার বল?
পরিকল্পনাকারী একজন : গত সাত-আটদিন হবে আনুমানিক, হ্যাঁ! তখন তো ওদের সঙ্গে কমবেশি আমারে নিয়ে বাড়াবাড়ি চলে। হ্যাঁ, বদখরার যে চায়ের দোকান আছে চন্ডিপুর।
হাশেম রেজা : ওরা কারা, ওরা কারা?
পরিকল্পনাকারী একজন : বদখরা চন্ডিপুরের।
হাশেম রেজা : তুই কাদের সঙ্গে চলছিলি, নাম বল?
পরিকল্পনাকারী একজন : চন্ডিপুরের বদখরা।
হাশেম রেজা : নাম বল, তুই কার সঙ্গে গিয়েছিলি ওখানে?
পরিকল্পনাকারী একজন : সাঈদ নিয়ে গিয়েছিল আমায়।
হাশেম রেজা : আর কারা কারা?
পরিকল্পনাকারী একজন : সাঈদ আমায় একা নিয়ে গিয়েছিল, আমার মোটরসাইকেলে করে।
হাশেম রেজা : হু, আচ্ছা বল তারপর…
পরিকল্পনাকারী একজন : রাত ১১টা সাড়ে ১১টা হবে বদখরা বসে আছে। জ্বি, সবাই আছে, সাঈদ বললো দোস্ত! সফির সাথে কথা ফাইনাল হয়ে গেছে। কাজ করে ফেলতে হবে, আমি বলছি কী কাজ? বলছি বুঝ না নাকি, হাশেম রেজাকে পেড়ে (মেরে) দিতে হবে। কীভাবে পাড়বা… বদখরা বলছে সে তো মানুষ, আজরাইল না, বাঘও না, ভাল্লুক না, আগে বুঝাবো আপস করে কি-না, যদি আপস না করে, মাল তিনটা আছে, একবারে ক্লিয়ার করে দিয়ে বেরিয়ে পরুম।
হাশেম রেজা : কে বললো এ কথা?
পরিকল্পনাকারী একজন : বদখরা আর সাঈদ বললো, সফির সাথে কথা হয়ে গিয়েছে, যেকোনো অবস্থায় পেড়ে (মেরে) দেবো। আগের মাল কয়ডা আছে, তিনটা আছে। সাঈদ বলছে, কি কি মাল আছে কাছে, আমি আবার বাড়ি এসে মনে মনে লিখে রেখেছিলাম।
হাশেম রেজা : কী কী মাল আছে বল?
পরিকল্পনাকারী একজন : মাস্কেট ফোল্ডিং, আরেকটা শেল্টার বন্দুক, আরেকটা সিরিনা ছক্কা।
হাশেম রেজা : এ তিনটা সাঈদের কাছে আছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : সাঈদের কাছে না, এটা বদখরার কাছে। সফির সঙ্গে কথা হয়ে গেছে এ তিনটা দিয়ে আপনাকে পেড়ে দেবে, কথা একবারে ফাইনাল হয়ে গেছে।
হাশেম রেজা : বদখরার কাছে এ মাল আছে, সাঈদের সাথে কন্ট্রাক হয়েছে সফি কন্ট্রাক করেছে।
পরিকল্পনাকারী একজন : সাঈদ বলেছে, সফির সাথে আমার কথাবার্তা ফাইনাল হয়ে গেছে, সুযোগ বুঝে পেড়ে (মেরে) দিতে হবে, কোনো কথা নেই। মাল আছে কয়টা, বলছে আগের মাল আছে তিনটা। কোনটা কোনটা আছে। বলছে এইটা এইটা আছে। মুখস্থ করে পরে আমি নামগুলো লিখে রেখেছিলাম, যদি মনে না থাকে তাই। আজ ভাবলাম আপনাকে কথাগুলো বলে দিই।
হাশেম রেজা : রাত কয়টার সময়?
পরিকল্পনাকারী একজন : ১১টা সাড়ে ১১টা হবে।
হাশেম রেজা : তোরে মোটরসাইকেল করে নিয়ে যায় রাত সাড়ে ১১টার সময়, এই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি! জ্বি! জ্বি!
হাশেম রেজা : মেশিন কি কি, কি কি মিশিন আছে বলতো দেখি আবার।
পরিকল্পনাকারী একজন : আমি তো আর দেখি নাই, নাম শুনলাম মাস্কেট ফোল্ডিং, শেল্টার বন্দুক, সিরিনা ছক্কা।
হাশেম রেজা : এটা আমারে মারার জন্য কন্ট্রাক্ট করেছে সফি, বদখরা আর সাঈদ।
পরিকল্পনাকারী একজন : সাঈদের মুখ থেকে এটা শোনা। তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়ে গেছে, কাজ সেরে ফেলবো।
হাশেম রেজা : কার সাথে আলাপ হয়েছে, জনবাণীর সফিক।
পরিকল্পনাকারী একজন : হ্যাঁ, জনবাণীর সফির সাথে আলাপ হয়েছে। সাঈদের বক্তব্য, তাছাড়া উপায় নাই, তাছাড়া রেজাল্ট নাই, এই এই করতে হবে। আমার কাছে… গুস্টিরে …
হাশেম রেজা : আর বদখরা?
পরিকল্পনাকারী একজন : বদখরার সাথে সাঈদের মিল আছে।
হাশেম রেজা : বদখরার ওই দোকান, তাই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি, জ্বি, জ্বি।
হাশেম রেজা : তাইলে এইসব অস্ত্র তার আছে এই তো, ওই অস্ত্র দিয়ে আমারে ফেলাই দেবে এই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ কাকা, ওরা এখন মেরে দিতে পারে।
হাশেম রেজা : না না তোরে মারবে না, তোর পক্ষে আমি জিডি করবো, তোরে নিয়া একটা জিডি করবো, ঠিক আছে তোর কোনো সমস্যা নাই। তোর নামেই জিডি করবো, তুই আমার সাথে থাকবি, ঠিক আছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা, নয়তো আমায় মেরে দেবে, আমায় বাঁচাতে হবে কাকা।
হাশেম রেজা : আচ্ছা বাঁচাবো, তোকে বাঁচানোর জন্য আমি আছি, তুই নিশ্চিত থাক।
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা, জ্বি কাকা, আসসালামু আলাইকুম।

হাশেম রেজা : ওকে ওকে, আচ্ছা শোন, জনবাণীর সফিক কত খাইছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : সফিক খাইছে ৪৫ হাজার।
হাশেম রেজা : সফিক ৪৫ হাজার, আর কে কে খাইছে মানে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো, তাই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : এক লাখ ২০ হাজারের মধ্যে আমি পাঁচ হাজার ২০০ টাকার মতো।
হাশেম রেজা : আরে পাগল, আমি যেটা বলি সেটা শোন, ৪৫ হাজার টাকা সফিক তোর কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছে।
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি, জ্বি কাকা চাঁদা নিয়েছে।
হাশেম রেজা : জনবাণীর সফিক তোর কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে তাই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি, জ্বি কাকা।
হাশেম রেজা : ও আর কোন জায়গা থেকে টাকা নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন: ও টাকা নিয়েছে নতুন গ্রামের ফকিরের কাছ থেকে।
হাশেম রেজা : ও কত টাকা নিয়েছে, কত টাকা চাঁদা নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : ওখান থেকে নিয়েছে ৭০ হাজার। আমারে ভয় দেখালো না হয় মেরে ফেলবে। তারা বলে, ‘ঢাকায় তোর নামে মিথ্যা মামলা দেবো’, জানের ভয়ও দেখায়।
হাশেম রেজা : আচ্ছা শোন, তোর কাছ থেকে আর কত টাকা খেয়েছে, কত টাকা নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : আমারে প্রেসার দিয়ে টাকা নিতে বাধ্য করেছে।
হাশেম রেজা : মানি ওর অর্ডারে তুই চাঁদা তুলে দিয়েছিস, এই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি, জ্বি কাকা।
হাশেম রেজা : আচ্ছা আর কে কে নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : আপনাকে পরে জানাচ্ছি।
হাশেম রেজা : বাকি আর কারা কারা?
পরিকল্পনাকারী একজন : ওরা তিনজন মিলে সফিসহ ভাগ নিলো শামীম, হিরো, সফি একা ৪৫ হাজার নিলো, বাকিটা ওদের ভাগ করে দিলো। এরপর আবার আমাকে ফোন দিয়ে বললো আরও ২৫ লাগবে। চা নাশতা খাওয়াবো, এই টাকাটা লাগবে। ৪৫ আর ২৫ কত হয় তাহলে কাকা।
হাশেম রেজা : তাহলে ৭০ হয়।
পরিকল্পনাকারী একজন : পরের দিন হিরোকে দিয়ে ফোন দিয়ে বললো আবার ১০ হাজার টাকা লাগবে।
হাশেম রেজা : এটা তো ওই জনবাণীর সফিক?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা, জনবাণীর সফিক, জনবাণীর নির্বাহী সম্পাদক।
হাশেম রেজা : ও, উনি আবার ১০ হাজার টাকা তোর কাছ থেকে চাঁদা নেয়।
পরিকল্পনাকারী একজন : গ্রামে গিতারানী নামের একজন মহিলা থেকে জমিজমা ঠিক করে দেবে বলে নিয়েছে ১০ হাজার টাকা, কাকা কোনো কাজ হয়নি, ১০ হাজার টাকা নিয়েছে কাকা।
হাশেম রেজা : আচ্ছা আর কে কে নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : আচ্ছা কাকা, আমি আরও মনে করে আপনাকে জানাচ্ছি।
হাশেম রেজা : আচ্ছা তোর মাধ্যমে ও এলাকার লোকজন থেকে টোটাল কত টাকা চাঁদা নিয়েছে?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা, মদনার ওখান থেকে এক লাখ ২৫, আর গিতারানীর কাছ থেকে ১০, নতুন গ্রামের সামছুল প্রতিবন্ধী ওর কাছ থেকে ৭০, আর সুবুলপুরের সাইফুলের কাছ থেকে ৮০ হাজার বর্ডারের ব্যবসা কথা বলে। ‘আমার নাম বললে গরু টরু কেউ ধরবে না, কোনো সমস্যা হলে আমারে ফোন দেবা।’
হাশেম রেজা : মানে তার হুকুমে তুই এই চাঁদাগুলো উঠাইতি, তাই তো?
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা, না হলে আমাকে ফেলে দেবে। বলে, ‘তুই বিএনপি করিস, তোকে এলাকায় একদম ক্রসফায়ার দিয়ে দেবো, তুই এখানে থাকতে পারবি না, ঢাকায় ২০টা মামলা দেবো, তোর লাইফ শেষ করে দেবো। আমি যা নির্দেশ করবো পদে পদে মানবি।’
হাশেম রেজা : তাইলে ওর নামে তুই জিডি করিস না কেন?
পরিকল্পনাকারী একজন : আমি তো আতঙ্কে ভয়ে ছিলাম, তাছাড়া আমি গরিব মানুষ, বাড়াবাড়ি করতে গেলে, জিডি করতে গেলে আরও ঝামেলা, আমি কোনো লোক পাচ্ছিলাম না।
হাশেম রেজা : তুই আমার বলে জিডি করবি, যে সে চাঁদা তুলেছে।
পরিকল্পনাকারী একজন : জ্বি কাকা।

হত্যার এমন পরিকল্পনার পরপরই দর্শনা থানায় তিনটা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বাদি হয়ে একটি মামলা করেন হাশেম রেজার বড় ভাই আব্দুল মজিত। মামলার নম্বর জিআর- ৯০/২০২০, জিআর- ৯২/২০২০, জিআর- ৭৪/২০২০। জানা যায়, জিআর- ৯২/২০২০ মামলায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলোÑ আবু সাঈদ, বদর উদ্দিন (বদখরা), রাশেদুজ্জামান হিরক (হিরো), শামীম ও রানা। হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক রানা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মানিক দাসের কাছে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উল্লিখিত আবু সাঈদ, বদর উদ্দিন (বদখরা), রাশেদুজ্জামান হিরক (হিরো), শামীমের নাম বলে। হত্যা পরিকল্পনাকারী গডফাদার সফিকুল ইসলাম সফিক ছিলো বলেও রানা স্বীকার করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের নামে আরও একটি মামলা রয়েছে, যার নম্বর জিআর- ২০০৬/২০১৭।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Comment